ট্যুর টিম (Tour Team) : বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে সাগরকন্যা খ্যাত অপরূপ এক জায়গা কুয়াকাটা। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী ইউনিয়নে অবস্থিত এ জায়গায় আছে বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার মতো জায়গা দ্বিতীয়টি আর এদেশে নেই। অনিন্দ্য সুন্দর সমুদ্র সৈকত ছাড়াও কুয়াকাটায় আছে বেড়ানোর মতো আরও নানান আকর্ষণ। আর আজকে আমাদের যাত্রা কুয়াকাটা। ভ্রমণের যাবতীয় তথ্য তুলে ধরছেন আবদুর রহমান। https://www.facebook.com/regal.abdurrahman
![]() |
| ছবি সংগৃহীত |
![]() |
| লঞ্চে আমরা-ট্যুর টিম বিডি, বামে থেকে, রিগেল, সজীব, ইমরান, ইয়াসিন। |
![]() |
| চলন্ত বাসের ছাদে। ছবিতে রিগেল আর সজীব, সাথে এক মুরুব্বি চাচাও আছে। |
কলাপাড়া পৌঁছানোর পর সেখান থেকে একটা অটোতে করে সোজা কুয়াকাটা পৌঁছে যাই। তবে যাওয়ার পথে দুজনেই বন্ধুসুলভ বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয় যারা আমাদের মত ঘুরার পাগল। তারাও কুয়াকাটা যাবে। খুবই চমৎকার মনের মানুষ ২জন। পুরা কুয়াকাটা সফরে ওনারা আমরা একসাথেই ছিলাম।
![]() |
| কুয়াকাটা সাগর পাড়ের রাস্তায়। এক পাশে হোটেল আর অন্য পাশে সাগর। |
কুয়াকাটায় ঘুরাঘুরি করার মত কয়েকটা সুন্দর জায়গা রয়েছে, চলুন বিস্তারিত বলছি.........
কুয়াকাটার কুয়া:
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
জনশ্রুতি আছে ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা রাখাইনদের মাতৃভূমি আরাকান দখল করলে বহু রাখাইন জায়গাটি ছেড়ে নৌকাযোগে আশ্রয়ের খোঁজে বেড়িয়ে পড়েন। চলতি পথে তারা বঙ্গোপসাগরের তীরে রাঙ্গাবালি দ্বীপের খোঁজ পেয়ে সেখানে বসতি স্থাপন করেন। সাগরের লোনা জল ব্যবহারের অনুপযোগী বলে মিষ্টি পানির জন্য তার এখানে একটি কূপ খণন করেন। এরপর থেকে জায়গাটি কুয়াকাটা নামে পরিচিতি পায়।
শুঁটকি পল্লী:
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
আসুন আবার ট্যুরে ফিরি.....
আমরা হোটেলে গিয়ে প্রথমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেই। আমাদের মধ্যে ১জন ক্লান্তিতে বলেই ফেলছে হোটেলের বাথরুমেই গোসল করে ফেলি। আমরা হাসতে হাসতে বললাম, কুয়াকাটা সৈকতে আসলাম কি বাথরুমে গোসল করতে? যাই হোক মজা করতে করতে বড় ভাইরাসহ আমরা ৪জনই বীচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হোটেল থেকে বের হই। কিছু খেতে ইচ্ছা ছিলো না কারো সাগরের ঢেউ দেখে। সাগরের ঢেউ ছিল অনেক তাই আর সমুদ্রে গোসলের লোভ কেউ সামলাইতে পারি নি। রুম থেকে রাস্তায় উঠতেই বীচের ঠান্ডা মনমুগ্ধকর বাতাসে আমাদের মন জুরায় যায়। সত্যিই এত ঠান্ডা বাতাসে আমরা রোদের তাপ টের পাই নি। বীচে যখন যাবই তাহলে শরীর একটু চাঙা করে যাই কি বলেন? তাহলে সাগরের পানিতে বেশি বেশি লাফানো যাবে। তাই রাস্তার পাশেই চায়ের দোকান থেকে আমরা হালকা চা নাস্তা করে নিলাম সবাই।
![]() |
| ক্যামেরার পিছনে সাগর কন্যা কুয়াকাটা। |
![]() |
| সাগরে একসাথে দৌড়ে নামার সময়। |
![]() |
| গোসলের সময়। |
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
দ্বিতীয় দিন খুব ভোরেই আমরা উঠে রওনা দিয়ে দেই সূর্যোদয় দেখার জন্য। আমরা হোটেল থেকে বের হতেই অনেক গুলো হোন্ডা দেখতে পাই। এই সাগরকন্যায় অজস্র হোন্ডা থাকে, এগুলো ভাড়ায় চালিত। আমরা ২টা হোন্ডায় করে হোটেল থেকে একটু দূরে যাই যেখান থেকে সূর্যোদয় আরো স্পস্ট দেখা যায়। ভাড়া ছিল ৫০টাকা একজন। আমরা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি কখন সূর্য উঠবে তার অপেক্ষায়। আমাদের মত আরো শত শত মানুষ আপেক্ষায় আছে সূয্যিমামার দেখা মিলতে। সবাই যার যার মত করে দেখার জন্য প্রস্তুত। অনেকেতো পানির মধ্যে গিয়েও দাঁড়িয়ে ছিল দেখার জন্য। সবাই ক্যামেরা নিয়ে প্রস্তুত এই মুহূর্তটাকে স্মৃতি বন্ধি করে রাখতে। কিন্তু দূর্ভাগ্য হায়ঃ যখন সূর্য উঠবে তখনই আকাশ মেঘে ঢেকে গেছে। সূর্য উঠার প্রায় ১৫-২০মিনিট পর সূর্য আমাদের চোখে পড়ে। আমরাসহ এখানে যারা আসে সুর্যাস্ত দেখার জন্য তারা সবাই খুব হতাশ।
![]() |
| সূর্য উদয় দেখতে হাজারও ভ্রমণ পিয়াসুরা। |
লাল কাঁকড়ার দ্বীপ:
কুয়াকাটা থেকে ফাতরার চরের দিকে যেতে হাতের ডান পাশে পড়বে এই দ্বীপ, এখানে ভোর সকালে আসলে লাল কাঁকড়ার মিছিল দেখা যাবে, আবার গঙ্গামতি চরের পূর্ব পাশেও লাল কাঁকড়া অবাধে ঘুরে বেড়ায়। তাদের সাথে সাক্ষাতের সময় ঐ একটাই - প্রথম ভোরে...
![]() |
| লাল কাকড়ার দ্বীপ- ছবি: সংগৃহীত। |
তবে খেয়াল রাখবেন, আপনার উপস্থিতি যেন কোন ভাবেই তাদের কে ক্ষতিগ্রস্থ না করে।
বৌদ্ধমন্দির ও রাখাইন পল্লী:
কুয়াকাটার খুব নিকটেই অবস্থিত মিস্ত্রিপাড়া। এখানেই দেখতে পাবেন আপনি বৌদ্ধ মন্দির যেখানে রয়েছে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার একটি বুদ্ধমূর্তি।
![]() |
| বৌদ্ধমন্দির - ছবি সংগৃহীত। |
![]() |
| ফাইল ছবি। |
![]() |
| টোনা, চিংড়ি ও কাকড়া। ছবি: রিগেল। |
![]() |
| খাওয়ার পূর্বে - ছবি ইয়াসিন। |
সবাই মজা নিলো আমাদের কাণ্ড দেখে। আমরা তখন গোসলটা করে ফেলি। ভালই লাগলো কারণ সাগরের ঢেউ আমাদের সকলকে মুগ্ধ করে। বাতাসতো ছিলই। আমরা হাটতে হাটতে গান গাইতে গাইতে হোটেলের দিকে ফিরি। চিৎকার করে গাওয়া আমাদের গান বাতাসে বাতাসে মিলিয়ে যায়। রাতে হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে আমরা রাতের খাবার খেতে বের হই। খাওয়া শেষে আমরা রুমে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ি।
লেবুচর ও ফাতরার বন:
সৈকতে গেলেই দেখেতে পাবেন অনেক মটরসাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। নিজে চালাতে পারলে মটরসাইকেল চালিয়ে চলে যেতে পারেন লেবুচর। ভাটার সময় মটর সাইকেল নিয়ে সৈকত ধরেই চলে যেতে পারবেন লেবুচর। সে এক অভাবনীয় অনুভূতি। লেবুচর থেকে খুব কাছেই ফাতরার বন। বলা হয়ে থাকে এই ফাতরার বন থেকেই শুরু সুন্দরবনের সীমানা। সুতরাং যাদের সুন্দরবন দেখা হয়নি তারা ইচ্ছা করলে ঘুরে আসতে পারেন ফাতরার বন। সেখানে যেতে চাইলে সৈকত থেকে ট্রলার ভাড়া করে যেতে হবে। আর এই ভ্রমণটি হবে আপনার জন্য একটি রোমাঞ্চকর ভ্রমণ। আপনার ট্রলারটি যখন সমুদে্রর সাদা ঢেউ কেটে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে মনে হবে যেন সিনেমার কোন স্বপ্ন দৃশ্য পাড়ি দিচ্ছেন।
টানা দেড় ঘন্টা ট্রলার চালিয়ে গেলে আপনি পৌছে যাবেন ফাতরার বন। এখানে পর্যটকদের আনাগোনা খুব একটা নেই। আর এখানে স্থানীয় লোকজনও খুব একটা দেখা যায় না। ফাতরার বনে নামলে পরে আপনার চোখে পড়বে মাইলের পর মাইল লম্বা বন-জঙ্গল। অনেকের মনে হতে পারে আপনি সুন্দরবনে এসে নেমেছেন। আসলে এটি আমতলী ফরেষ্ট রেঞ্জ। এখানে একটি বাংলো আছে আর পাশেই রয়েছে একটি সুন্দর পুকুর। এখানে বন্যপ্রাণীর বিচরণ নেই বললেই চলে। তবে পাখির কুহুতান হতে আপনি বঞ্চিত হবেন না এটা নিশ্চিত বলা যায়।
বনের গভীরে চলে গেছে নদী। আপনি ইচ্ছিা করলে ট্রলার নিয়ে আরো গহীনে যেতে পারেন। তাতে আপনার অবিজ্ঞতার ঝুলি কিছুটা হলেও বাড়বে। গহীনের নিস্তব্দতা আপনাকে আরো আপ্লুত করবে।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
গোসল শেষে আমরা দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে শেষ বারের মত ফটোশুট করে নেই। বিকেল পর্যন্ত আমরা ছবি তুলি। ছবি তোলা শেষে আমরা সবাই আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই।
![]() |
| শেষ সময়ে ফটোশুট- কিছুক্ষণ পরে ডুবে যাবে সূর্য। |
এখানকার খাবার খুবই বাজে বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। তবে সী-বিচের খুব কাছে একটা হোটেলগুলো খাবার রীতিমতন মুগ্ধকর, দামও কম। বেড়িবাধের উল্টা পাশের (শহর সাইডের) খাবার না খাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এখানকার চটপটি খুবই ভালো।
পরামর্শ ও করণীয়:
১) দল বেঁধে গেলে খরচ অনেক কম হবে।
২) ভারী জামা কাপড় না নেওয়াই ভালো। ব্যাগ যগ ছোট হবে ঘুরতে ততো মজা লাগবে।
৩) চলার সময় নিরবতার সাথে পথ চলুন। হৈ চৈ করা থেকে বিরত থাকুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। ভ্রমণ করতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা, শুকনো খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল/জার, কলার খোসা ইত্যাদি ফেলা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকবো। এগুলো আমাদের পরিবেশ দূষণ করার সাথে সাথে আমাদের ভ্রমণের জায়গাগুলোও নষ্ট করছে। সবাইকে অনুরোধ করছি, আমরা আমাদের পরিবেশ দূষণ করবো না। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কাছে। আমরা অতি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরবো আপনার ভ্রমণ কাহিনী।
Tags
ট্যুর টিম বিডি


















