ছোট একটি বিষয় নিয়ে এলাকায় বিভেদ দেখা দেয়। যা নিরসনে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে রায় প্রকাশ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইউএনও।
তার দুই দিন পর পুলিশ কর্মকর্তা গিয়ে উল্টো রায় দেয়ায় বিভেদ চরম আকার ধারন করে। বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়াতে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করে যুবসমাজের ব্যানারে গণপিটিশন দাখিল করেছেন স্থানীয়রা।
বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জেলা প্রশাসক বরাবরে এ গণপিটিশন দাখিল করেন স্থানীয় যুবসমাজ।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের শঠিবাড়ি বাজারে উত্তর গোবদা দাখিল মাদরাসার জমিতে গড়ে উঠা ওয়াক্তি মসজিদ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে সৃষ্ঠ বিভেদ মিটাতে এ ঘটনা ঘটে।
গণপিটিশন ও স্থানীয় প্রবীনরা জানান, ১৯০১ সালে স্থানীয়রা উপজেলার শঠিবাড়ি বাজারে ২০ শতাংশ জমিতে উত্তর গোবদা দাখিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সরকারের বিধিমতে জমির পরিমান কম হওয়ায় স্থানীয়রা পাশে জমি দান করে উত্তর গোবদা দাখিল মাদরাসা স্থান্তরীত করেন এবং পুরাতন মাদরাসা মাঠটিকে উত্তর গোবদা কেন্দ্রীয় ঈদগা মাঠ ঘোষনা করা হয়। পরবর্তিতে উত্তর গোবদা বাইতুননুর জামে মসজিদের ৩ শশতাধিক পরিবারের মসুল্লি ও শঠিবাড়ি বাজারে আগত হাটুরে মসুল্লিদের নামাজের জন্য ঈদগা মাঠের এক পাশে একটি ওয়াক্তি মসজিদ গড়ে উঠে। ওয়াক্তিয়া মসজিদ ও ঈদগা মাঠটি পরিচালনা করছেন উত্তর গোবদা বাইতুননুর জামে মসজিদের পরিচালনা কমিটি। যা কালক্রমে দ্বিতল ভবনের কাজ করছেন স্থানীয় মসুল্লিরা।
সাম্প্রতিক সময় স্থানীয় জসোমুদ্দিনের ছেলে আনিচুর রহমান ৫/৭ টি পরিবার নিয়ে এ ওয়াক্তিয়া মসজিদটিকে জামে মসজিদ ঘোষনা করেন। যা নিয়ে সৃষ্টি বিভেদ হামলা ও মারামারিতে রুপ নেয়। এ নিয়ে উভয় পক্ষ স্থানীয় থানা ও জেলা প্রশাসনে একাধিক অভিযোগ দায়ের হয়। এটা নিয়ে অনেকটা বিভ্রান্তে পড়ে জেলা প্রশাসন।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের নির্দেশে স্থানীয়দের এ বিভেদ নিরসনে গত ১৮ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে গিয়ে উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসেন আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) আলী আকবর। আলোচনা শেষে ইউএনও লিখিত রায় ঘোষনা করে জানান, "মসজিদ ও ঈদগা মাঠ পুর্বের ন্যায় ওয়াক্তিয়া মসজিদ হিসেবে এবং সকলের জন্য সর্বদাই উন্মুক্ত থাকবে। তা পরিচালনা করতে একটি কমিটি গঠন করতে স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান উপজেলা বিএনপি'র সাবেক সদস্য সচিব ছালেবুজ্জামান প্রামানিককে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এ রায় সকলে তাৎক্ষনিক মেনে নিলেও পরবর্তিতে আনিচুর রহমানরা বিরোধিতা করেন।
রায় বিপক্ষে গেলে আনিচুর রহমান গংরা গেল ১৯ সেপ্টেম্বর উক্ত মসজিদ খোলা থাকলেও রায়ের প্রতিবাদ স্বরুপ সড়কে জুম্মার নামাজ আদায় করে ছবি ছড়িয়ে দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এতে বিভ্রান্ত তৈরি হলে দুইদিন পর লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(এ সার্কেল) একেএম ফজলুল হক ও ডিবি ওসি সাদ আহমেদ ঘটনাস্থলে গিয়ে পুনরায় বৈঠক করেন। এ বৈঠকে তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইউএনও'র পুর্ব ঘোষিত রায়ের উল্টো রায় ঘোষনা করেন। তাদের রায়ে বলা হয়, ওয়াক্তিয়া মসজিদটি জামে মসজিদ হবে। এর বিরোধিতা করলে কঠোর ভাবে দমন করা হবে বলেও হুশিয়ারী দেয়ার অভিযোগ। এতে ক্ষেপে যান অপর পক্ষটি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই দিনের ব্যাবধানে পাল্টা পাল্টি রায়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে স্থানীয়রা। ফলে দাঙ্গার শ্বঙ্কা বেড়ে যায়। দুই পক্ষই স্ব স্ব পক্ষের রায় বহালের দাবিতে মারমুখি হয়ে উঠে। বড় ধরনের বিবাদ ও দাঙ্গা এড়াতে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিতে বৃহস্পতিবার দ্রুত হস্তক্ষেপ চেয়ে স্থানীয় যুবসমাজের ব্যানারে একটি গণপিটিশন জেলা প্রশাসক বরাবরে দায়ের করা হয়।
লালমনিরহাট ডিবি'র ওসি সাদ আহমেদ বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দেয়া সিদ্ধান্ত আমাদেরকে কেউ জানায়নি এবং সড়কে নামাজ আদায়ের বিষয়টি নজরে আসায় আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। স্থানীয়রা আমাদের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা কোন সিদ্ধান্ত দেই নি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম ফজলুল হককে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার তার দেয়া সিদ্ধান্তের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আনিচুর রহমান নিজে না থেকে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন। বৈঠকে আমরা বলেছি, এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুর্বের ন্যায় সব বহাল থাকবে এবং সাবেক চেয়ারম্যানকে নতুন করে একটি পরিচালনা কমিটি করতে নির্দেশ দেয়া হয়। তবে এ সিদ্ধান্তের পরে পুলিশ অফিসার গিয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টে দেয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। যা ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচএম রকিব হায়দার বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মকর্তারা গিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এটা পাল্টাপাল্টির কিছুই নেই। পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসন বিষয়টি অবগত রয়েছে। তবে বিশৃঙ্খলা এড়াতে এলাকার শান্তি প্রতিষ্ঠায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।