অবুঝ শিশু তার মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আমার চোখেও অশ্রু ঝরছিল

ফাতিহার বয়স এখনো দুই বছর পূর্ণ হয়নি, বাবা-মায়ের সাথে চট্টগ্রামে একটি ভাড়া করা বাসায় হাসি আনন্দে বড় হচ্ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ফাতিহার মায়ের সাথে বাবার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পাষাণ বাবা খাইরুল ইসলাম ফাতিহার মাকে মারধর করেও আক্রোশ কমেনি। জটিল নিমোনিয়ায় আক্তান্ত অবুঝ শিশু কন্যা ফাতিহাকে রাতের অন্ধকারে নিয়ে পালিয়ে যায়। 


ডাক্তারের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসারত শিশু কন্যা ফাতিহাকে হারিয়ে মা লিমা আক্তার পাগলের মতো সারা চট্টগ্রামের খোঁজাখোঁজি করেও কোন হদিস পাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে মা লিমা আক্তার জানতে পারে কুমিল্লার দেবিদ্বারের দুয়ারিয়া গ্রামের খাঁ বাড়িতে একটা বদ্ধঘরে তালা মেরে লুকিয়ে রেখেছে দুগ্ধপোষ্য এই অসুস্থ ফাতিহাকে।

তাৎক্ষণিক ভাবে মা লিমা আক্তার তার বাবার বাড়ি দেবিদ্বার থানার চুলাশ গ্রামে এসে আত্মীয় স্বজনসহ লিমার স্বামীর বাড়ি দুয়ারিয়া গ্রামে ছুটে যায়। সামাজিক ভাবে যত ধরনের চেষ্টা সব কিছু প্রয়োগ করেও অবুঝ শিশু কন্যা ফাতিহাকে উদ্ধার করতে ব্যার্থ হয়। ফাতিহার বাবা খাইরুল ইসলামের একই কথা আমার সন্তান আমি যা ইচ্ছা তাই করবো কাউকে দিব না।

সামাজিক প্রচেষ্টা ব্যার্থ হবার পর দেবিদ্বার থানায় অভিযোগ করা হলে থানা কর্তৃপক্ষ জানায় এটা দীর্ঘ আইনী প্রকৃয়া, আমরা তল্লাশি, তদন্ত করতে করতে যদি অসুস্থ শিশুটির কিছু হয়ে যায় এই দায়িত্ব কে নিবে, আপনারা বরং আদালত থেকে শিশুটি উদ্ধারের আদেশ নিয়ে আসুন। 

বেলা প্রায় ১২.৩০ মিনিটে অসহায় লিমা আক্তার ও তার অশিক্ষিত সামর্থহীন কিছু লোক আমাকে কুমিল্লা আদালতে খুঁজতে থাকে, এক পর্যায়ে প্রায় বেলা ১.০০ টার পর আমাকে খুঁজে পেয়ে সমস্ত বিষয় অবহিত করে। আমার দৃষ্টিতে দেবিদ্বার থানা কর্তৃপক্ষ একটা শিশুর প্রাণ রক্ষার্থে জরুরি ভাবে শিশুটিকে উদ্ধার করে কোর্টে প্রেরণ করাটাই ছিল উপযুক্ত পদক্ষেপ। কিন্তু হয়তো পরিবারটি অসহায় বলেই এগিয়ে আসেনি।

আমি তরিঘরি করে সংশ্লিষ্ট কোর্টে ফৌজদারী কার্য্য বিধি আইনের ১০০ ধারায় সার্চ ওয়ারেন্ট চেয়ে আবেদন প্রস্তুত করতে করতে কোর্ট প্রায় শেষ পর্যায়ে। সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ সহকারী জসিম উদ্দিন অত্যন্ত সৎ, বিচক্ষণ ও দক্ষ একজন দায়িত্বশীল মানুষ। উনাকে সংক্ষেপে বিষয়টা বলাতেই উনি শিশুটি জীবন মরন সমস্যাটা বুঝতে পারলেন, বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জনাব, বিল্লাল হোসেন সাহেবের কাছে আর্জিটি উপস্থাপন করা মাত্র বিজ্ঞ আদালত শিশু কন্যাটির মা লিমা আক্তারের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে দেবিদ্বার থানায় কর্তৃপক্ষকে শিশুটিকে উদ্ধার করতে যথাযথ আদেশ দিলেন।

সকল স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করে বিজ্ঞ আদালতের অর্ডার দেবিদ্বার থানায় পৌছানোর পর থানা কর্তৃপক্ষ দ্রুততার সাথে প্রয়োজনীয় ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশু কন্যা ফাতিহাকে মানবেতর পরিবেশ ও অত্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে কিছুক্ষণ আগে মায়ের হাতে তুলে দেয়।

শিশুটিও যেনো তার পতিত বিপদ অনুধাবন করতে পেরেছিল, এসেই কি এক মামায়, মমতায় শুধু আমাকেই জড়িয়ে ধরতে চাইছে বার বার। আমি শিশুটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানতে চাইলাম, কি হয়েছিলো তোমার, কথা বলা এখনো শিখেনি শিশুটি, এক অব্যক্ত বোবা কান্না দেখতে পেলাম শিশুটির চোখেমুখে। মুহুর্তেই শিশুটিকে তার মায়ের কোলে তুলে দেয়ার পর শিশুটির ভুবনমোহিনী  পৃথিবী জয় করা হাসিতে আমার চোখে কখন অশ্রু ঝরছিল আমি বুঝতেই পারিনি। ভালো থেকো ফাতিহা, ভালো থাকবেন ফাতিহার আম্মু লিমা আক্তার।

Post a Comment

Previous Post Next Post