কক্সবাজারে হাম আতঙ্ক: ৪ জনের মৃত্যু, ঝুঁকিতে আরও শতাধিক শিশু

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে বর্তমানে ভয়াবহ সংক্রমণ ঝুঁকিতে রয়েছে ভর্তি শিশুদের একটি বড় অংশ। অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম নিয়ন্ত্রণে ‘ডেডিকেটেড হাম ওয়ার্ড’ চালু করা হলেও সীমিত আসন ও অব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।


হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য মাত্র ৮টি শয্যা নিয়ে একটি অস্থায়ী ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে, একটি শয্যাতেই গড়ে দুই থেকে তিনজন শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। জায়গা সংকটের কারণে সাধারণ রোগে আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গেই হাম আক্রান্ত শিশুদের রাখা হচ্ছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এছাড়া হাম ওয়ার্ডে প্রবেশে কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অবাধে স্বজনদের যাতায়াত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একেকজন রোগীর সঙ্গে তিন থেকে চারজন স্বজন এবং সুস্থ শিশুরাও হাসপাতালে প্রবেশ করছে, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে আরও বহু শিশু সেখানে ভর্তি রয়েছে।

রোগীর পিতা আবদুল মান্নান জানান, তার ৯ মাস বয়সী সন্তান প্রথমে সাধারণ শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। পরে শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে তাকে হাম ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। তিনি বলেন, “এখানে কে হামে আক্রান্ত আর কে অন্য রোগে আক্রান্ত তা বোঝা কঠিন। সবাই একসাথে থাকছে, যা খুবই বিপজ্জনক। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কয়েকজন নার্স জানান, অনেক শিশু অন্য রোগ নিয়ে ভর্তি হয়ে পরে হাম আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, সাধারণ রোগীদের সঙ্গেও হাম আক্রান্ত শিশু রাখা হচ্ছে। একজন শিশুর সঙ্গে পরিবারের অনেক সদস্য আসছেন, এমনকি সুস্থ শিশুও নিয়ে আসছেন। এতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। 

শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে ৮টি শয্যা নিয়ে হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খুব দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ আইসোলেটেড হাম ওয়ার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। 

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। একটি আক্রান্ত শিশু থেকে একটি এলাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু সংক্রমিত হতে পারে। 

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। খুব দ্রুতই পূর্বের করোনা ওয়ার্ডে একটি আইসোলেটেড হাম ইউনিট চালু করা হবে। 

এদিকে, পরিস্থিতির জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকা। তিনি বলেন, “এত বড় ঝুঁকির জন্য আগাম প্রস্তুতি থাকা উচিত ছিল। প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সাথেও সমন্বয় করতে হবে। 

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মং টিং ঞো বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি। 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, তিনি নিজে ওয়ার্ডটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, “আলাদা একটি আইসোলেটেড ওয়ার্ড চালুর চেষ্টা চলছে। তবে পূর্ণাঙ্গ আইসোলেশন সেন্টার চালু করতে কিছু অবকাঠামোগত প্রস্তুতি প্রয়োজন।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Post a Comment

Previous Post Next Post