মুহূর্তেই মনটা যেন অন্য কোথাও চলে গেল

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বাসার নিচের টং দোকানের এক কাপ চা না খেলে যেন সকালটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মনে হয়, চায়ের সেই ধোঁয়া ওঠা কাপে প্রথম চুমুক না দিলে দিনের শুরুটা শুভ হয় না। আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও সেই পরিচিত টং দোকানের এক কাপ চা-দিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার এক নীরব অনুষঙ্গ।


কয়েক বছর ধরে রাজধানীর ব্যস্ততম একটি এলাকায় বসবাস করছি। চারপাশে নিরন্তর ছুটে চলা মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন, শহরের কোলাহল-সবকিছুর মাঝেও গলির মোড়ে থাকা ছোট্ট সেই টং দোকানটাই যেন আমার নিজের জায়গা। সকাল-বিকেল অফিস শেষে সেখানে গিয়ে দাঁড়ানো, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা দেওয়া-এভাবেই কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে কত মানুষের গল্প যে শুনেছি, কত হাসি-কথা আর দীর্ঘশ্বাস যে জমে আছে সেখানে, তার হিসাব নেই। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও ওই টং দোকানটাই যেন এক টুকরো নির্ভার সময়।
আজও প্রতিদিনের মতো চা খেতে গিয়েছিলাম। সবকিছুই ছিল চেনা-চায়ের স্বাদ, দোকানদারের হাসি, পরিচিত মুখগুলো। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল ভিন্ন কিছু। নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম।
চায়ের কাপে চুমুক দিতেই কানে ভেসে এলো ইসলামী গজলের সুর। মুহূর্তেই মনটা যেন অন্য কোথাও চলে গেল। খেয়াল করে দেখলাম, পাশের গলিতে নতুন একটি মুদি দোকান দেওয়া হয়েছে। দোকানের ভেতর থেকে ভেসে আসছে সেই গজল। সকালবেলার নিস্তব্ধতায় সুরটা বেশ মন ছুঁয়ে গেল।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কৌতূহল সামলাতে না পেরে এগিয়ে গেলাম দোকানটির দিকে। ভেতরে দেখি-ষাটোর্ধ্ব এক বয়স্ক মুরুব্বি, পরনে পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, মুখভরা দাড়ি। কোনো তাড়া নেই, কোনো ব্যস্ততা নেই-নীরবে বসে গজল শুনছেন।
সালাম দিলাম। তিনি সৌজন্যের সঙ্গে সালামের জবাব দিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন? এই দোকানে আপনাকে আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “কয়েকদিন হলো দোকানটা ভাড়া নিয়েছি।”
তার কথা বলার ভঙ্গিতে মনে হলো, তিনি একজন শিক্ষিত মানুষ। কৌতূহল থেকেই জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বাসা কোথায়? পরিবারে কারা কারা আছেন? তিনি জানালেন, পরিবারের সবাই এই শহরেই থাকেন।
মনের মধ্যে তখন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। ভাবলাম, হয়তো আর্থিক কোনো সমস্যার কারণে এত সকালে দোকানে আসতে হচ্ছে। প্রশ্নটা করেই ফেললাম-এই শীতের সকালে একটু দেরি করে আসলেও তো পারতেন, কজন কাস্টমারই বা আসে?
তার উত্তর শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম।
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “আমি তো টাকার জন্য দোকান করি না।”
অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কেন দোকান ভাড়া নিলেন? আর এত সকালেই বা কেন আসেন? তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ঢাকায় আমার নিজের একটি ছোট বাড়ি আছে। ব্যাংকেও টাকা আছে। কিন্তু বাড়িতে শান্তি নেই। সেখানে থাকতে ভালো লাগে না। তাই দোকানে আসি।
আমি বুঝতে পারছিলাম না, বারবার প্রশ্ন করে তাকে বিরক্ত করছি কিনা। কিন্তু তিনি যেভাবে ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিচ্ছিলেন, তাতে মনে হলো-তিনি কথা বলতে চাইছেন, হয়তো দীর্ঘদিনের জমে থাকা কথাগুলোই বলছেন।
কথায় কথায় তিনি জানালেন, বাসায় থাকার মতো যত্ন আর আপনজনের সঙ্গ পান না বলেই এই সিদ্ধান্ত। বাসায় বসে মন খারাপ করার চেয়ে দোকান খুলে বসে থাকাই তার কাছে স্বস্তির। প্রতিদিন সকালে হালকা নাস্তা করে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন। রাত হলে শুধু ঘুমানোর জন্য বাড়িতে ফেরেন। দুপুরে দোকানেই খেয়ে নেন, নামাজও দোকানের ভেতরেই আদায় করেন।
আমি নির্বাক হয়ে তার কথাগুলো শুনছিলাম। চোখের সামনে বসে থাকা মানুষটি যেন হঠাৎ করে অনেক বড় হয়ে গেল-অথচ ভেতরে ভেতরে কতটা একা!
যে বয়সটা হাসিখুশি দিন কাটানোর, ভালোবাসা আর সঙ্গ পাওয়ার কথা-সেই বয়সে পরিবার ছেড়ে একাকিত্ব বেছে নিতে হচ্ছে।
এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে…? যে মানুষটা পরিবারের জন্য সারাটা জীবন নিজেকে উৎসর্গ করলো শেষ বয়সে এসে পরিবারের নিকট তিনিই এখন বোঝা হয়ে গেলেন।
রাজধানীর প্রতিটি গলি একেকটা গল্পের সমান। চোখের সামনে এমন হাজারও না জানা গল্প ভেসে বেড়ায় তবে আমরা তা জানি না।

Post a Comment

Previous Post Next Post